এনআরসি ও সিএএ ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়
১৯৭১-এ বাংলাদেশের ১ কোটি শরণার্থী যখন ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তখন কেবল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকেনি। ২০১৭ সালে এসে ১১ লাখ রোহিঙ্গার জীবনের ভার যখন বাংলাদেশকে নিতে হচ্ছে তখন মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিপীড়ন সে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হতে পারে না। আজ পৃথিবীর সবচাইতে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশকে যে রোহিঙ্গাদের বোঝা বহন করতে হচ্ছে সে বিষয়ে আমরা ছিলাম সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত। ১৯৮২ সালে যখন মিয়ানমারে নাগরিকত্ব আইনে রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গা নিপীড়নের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছিল, তখন বাংলাদেশ বোধহয় কল্পনাও করেনি মাত্র ৩৫ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশকে এক কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। আজ ভারতের নাগরিকত্বপঞ্জি ‘এনআরসি’ ( (National Registry of Citizenship) এবং ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের সংশোধন আইন, ‘সিএএ’ (Citizenship Amendment Act 2019) ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আরেক সীমান্তে রাষ্ট্রহীন শরণার্থীর নতুন ঢল সৃষ্টি করতে পারে, এটা বুঝবার জন্য কোনো বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ভারত থেকে মানুষজনের বাংলাদেশে প্রবেশের খবর ইতিমধ্যে প্রকাশ হতে শুরু করেছে। এনআরসিতে ২১ ডিসেম্বর ২০১৪ সালের আগে ভারতে আসা লোকজন ৬ বছর সেখানে বসবাস করে থাকলে ভারতীয় নাগরিকত্ব লাভের অধিকারী হবে। সিএএতে স্পষ্ট করে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে আগত ৬টি সম্প্রদায়ের নিপীড়িত সংখ্যালঘুদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, অথচ নিপীড়িত ব্যক্তি মুসলমান হলে এই আইন অনুযায়ী সে বাদ পড়বে। বাংলাদেশি নাগরিক ভারত ভ্রমণ করবার সময় ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে হিন্দু হলে প্রতিদিন তাকে যে জরিমানা গুনতে হবে, মুসলমান হলে তা হবে দুইশ গুণ বেশি। মুসলমান-বিদ্বেষী এই আইন ভারতীয় সংবিধানে ১৪ নম্বর ধারার পরিপন্থী, যেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে Indian constitution prohibits the state from denying to any person equality before the law or the equal protection of the laws within the territory of India। এইসব বিধানে যে বাংলাদেশকে জড়ানো হয়েছে তা স্পষ্ট এবং তাতে করে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিরা যে এই আইনের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তা নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। তাই বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ, শিক্ষক, পণ্ডিত, গবেষক, সাংবাদিক নুরু, পুষি, আয়েশা, শফি সবার হক আছে এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করবার। আসামের ১৯ লাখ বাঙালির রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বার আশঙ্কা, নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে না পারা মানুষের জন্য ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করা, বাংলাদেশের জন্যে অশুভ বার্তা বহন করে। এক আসামেই এখন ১০টা ডিটেনশন ক্যাম্প চালু আছে। নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া মানুষদের জন্য তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার জন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন এমন আরও অনেক জেলখানা সেখানে তৈরি হচ্ছে। এরই মধ্যে নাগরিকত্ব আইন বিরোধী বিক্ষোভে ২৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
এনআরসি এবং সিএএর মাধ্যমে ভারত রাষ্ট্র হিসেবে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের সাংবিধানিক মূলনীতি এবং আধুনিক ভারত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন সেক্যুলার আদর্শের মৌলিক বদল ঘটিয়ে উচ্চবর্ণ হিন্দুদের, হিন্দুত্ববাদী ধনীদের করপোরেট স্বার্থের সংরক্ষণকারী রাষ্ট্রে রূপান্তরের প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রের এই ফ্যাসিবাদী রূপান্তর বাংলাদেশের এবং গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই এক অশনি সংকেত। ভারতের প্রখ্যাত লেখক অরুন্ধতী রায় বলেছেনÑ ভারত সরকার একটি গরিব-বিরোধী, উচ্চবর্ণের করপোরেট-মিলিটারি শাসিত রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে। যেখানে কাগজপত্র, নথিতে নাম-পরিচয়ের হাজার বিভ্রান্তি ভারতীয় আমলাতন্ত্রের স্বাভাবিক অবস্থা, গরিব-অশিক্ষিত লোকের পক্ষে এসব দলিল হাজির করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। মামলা-মোকাদ্দমা, কোর্ট-কাচারি করবার মতো সময়, সামর্থ্য, শক্তি, যোগাযোগ কোনোটাই তাদের নেই। নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের পর স্বামী-শ্বশুরের বাড়ি চলে যাওয়ার সময় কাগজপত্র সঠিকভাবে গুছিয়ে রেখে নিজের নাগরিকত্বের প্রমাণ হাজির করা এক চরম দুর্ভোগের সৃষ্টি করবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের চরম অর্থনৈতিক সংকটকে আড়াল করতেই পরিচয়ের রাজনীতিকে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে।
এই সমস্যার নাড়ি পোঁতা আছে ব্রিটিশ-ভারতের পার্টিশনে : রাজধানীতে গণসংহতি আন্দোলন আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস যথার্থই বলেছেন যে এই সমস্যার নাড়ি পোঁতা আছে ব্রিটিশ-ভারতের পার্টিশনের সহিংসতা, যন্ত্রণা ও দুর্ভোগের মধ্যে। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, সর্বপ্রাণবাদী, প্রকৃতি পূজারী বিচিত্র ধর্মবিশ্বাসী বহুজাতির ভারতবর্ষকে স্বাধীনতার স্থপতিরা হিন্দু-মুসলমান দুই জাতিতে বিভাজনের কল্পনা কেন করেছিল, কেমন করে করেছিল, তা আজও এক ধাঁধার মতো রয়ে গেছে। এছাড়াও হিন্দুধর্ম নিজেই এক বহুবিচিত্র বিশ্বাস ও আচার-বিচারের সমন্বিত বিশ্বাসের সমষ্টি, মুসলমানের মধ্যে আছে শিয়া-সুন্নি-আহমদিয়ারা, আহলে-হাদিস, কাদেরিয়া-চিশতিয়া তরিকা, বৌদ্ধদের হীনযানী-মহাযানী ধারা। আছে সেক্যুলার, অজ্ঞেয়বাদী, অবিশ্বাসী ও নাস্তিক গোষ্ঠী। চাকমা, মান্দি, সাঁওতাল, মনিপুরী, হাজং, পাত্র, মুণ্ডা, কোল, মুরং, কুকি, লুসাই, বনযোগী, বাজিকর, ধীবর, শবর, যাযাবর, বেদেদের বহু বিচিত্র ধর্মের মানুষদের কথা পার্টিশনের সময় ভাবা হয়নি কেন, আজও তার কোনো জবাব নেই। হিন্দুস্তান-পাকিস্তান হলে এতো রকম মানুষেরা কোথায় যাবে? হিন্দুস্তানে ট্রাইবাল এবং আদিবাসীদের কী হবে? মুসলমানের রাষ্ট্রে আদিবাসীদের জায়গা কোথায় হবেÑ এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবনা-চিন্তা করা হয়েছিল বলে মনে হয় না। ভারতের ‘নিপীড়িত মুসলমান’ ক্যাটাগরি তৈরি করেছিল উইলিয়াম হান্টারের মতো ইংরেজ প্রশাসকরা।
ভারতীয় কংগ্রেস নেতা মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এই ইঙ্গিত দেন যে, ভারতীয় নিপীড়িত মুসলিমের জন্য ‘হাজার বছরের নিপীড়িত ইহুদি’দের ইসরায়েল রাষ্ট্রের আদলে মুসলমানদের জন্য পৃথক বাসভূমির ধারণা পেয়েছিলেন ‘অক্স-ব্রিজ’ শিক্ষিত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ লন্ডনে তার তরুণ বন্ধুদের কাছ থেকে। ইহুদি রাষ্ট্রের মডেলে মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমির ধারণা বিভ্রান্তিকর। মুসলমান মুঘলরা মাত্র দুইশ বছর আগেই সাড়ে তিনশ বছর ভারতের শাসক ছিল, অটোমানরা চৌদ্দশত থেকে বিংশ শতকের গোড়ার দিক পর্যন্ত তুরস্কে সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছে। ইউরোপ, আফগানিস্তান, ইরান, সিরিয়া, আরবের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে মুসলমানরা শত শত বছর শাসক হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। মুসলমান সুলতানরা কয়েকশ বছর বাংলায় সমৃদ্ধ শাসনকাল উপভোগ করেছিলেন। মুসলমান হিসেবে হীনমন্যতার অন্তত ঐতিহাসিক কারণ ছিল না। ইউরোপীয় ইহুদিদের নিপীড়নের সঙ্গে মুসলমানদের অবস্থার কিছুমাত্র তুলনীয় ছিল না। মুসলমানদের চাইতে বহুগুণ নিপীড়িত, দলিত, লাঞ্ছিত-বঞ্চিত, জাতিগোষ্ঠী ব্রিটিশ ভারতে ছিল এবং স্বাধীন ভারতেও আছে। মুসলমানদের মধ্যেও আছে আশরাফ-আতরাফ, উঁচু-নিচু জাত-বংশ, জোলা-সৈয়দ। সব নিপীড়িত জাতি-ধর্মের জন্য পৃথক পৃথক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার মতো অবাস্তব কল্পনা আর কী হতে পারে? অপরের বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে গ্রহণ করে বহুত্ববাদী ভারতই ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সত্য। মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাকারীরা ‘ভারতে রয়ে যাওয়া অবশিষ্ট’ মুসলমান ভাই-বোনদের আরও বেশি সংখ্যালঘু ও বিপন্ন হয়ে পড়বার কথা ভাবেননি বলেই আজ ৭২ বছর পরও দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিকদের তার খেসারত দিতে হচ্ছে। ভারতীয় মুসলমানদের অধিকতর নিপীড়িত বর্গে পরিণত হওয়ার দিকে ঠেলে দেওয়ার দায় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকারীদের কোনো অংশে কম নয়, যারা নিজেরা ছিলেন উঁচু শ্রেণির মুসলমান এবং ভারতে শ্রেণি, লিঙ্গ, জাতিবর্ণ বৈষম্যের গভীরতা এবং সমাজের গভীরে ঔপনিবেশিক ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে না ভেবে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছিলেন।
ঔপনিবেশিক ইতিহাসবিদ্যার পরিকাঠামোয় ভারতের ইতিহাসের যুগ বিভাজন করা হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতেÑ বৌদ্ধ যুগ, হিন্দু যুগ, মুসলমান যুগ এবং আধুনিক যুগ হিসেবে। এই কলোনিয়াল ইতিহাসবিদ্যাকে ভেঙে ভারতের ইতিহাসের স্বরাজ কায়েমে নিয়োজিত ইতিহাসবিদরা তাই বিজেপি সরকারের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। রামচন্দ্র গুহ, ইরফান হাবিব, রমিলা থাপারের মতো বিশ্বখ্যাত ভারতবেত্তাদের গ্রেপ্তার, হয়রানি, অপদস্ত করা থেকে এটা পরিষ্কার যে, ভারতের অতীত ইতিহাস আজ বর্তমানের ক্ষমতার খেলার পাটাতন তৈরি করেছে। ইংরেজদের বানানো ওরিয়েন্টাল ভারতের মিথিক গৌরবের গাথা তুলে আনছে রামায়ণ-মহাভারতের মহাকাব্যিক বয়ানে, যার পাঠ ভারতীয় আদতে বহুসংস্কৃতির রীতি-রেওয়াজেরই গল্প।
আমি যেন তার নিরাপত্তা হই : বাংলাদেশের করণীয় : এই সময়ের দক্ষিণ এশিয়ার শক্তিশালী তরুণ কণ্ঠস্বর ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির নেতা জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ড. কানহাইয়া কুমারের ভাষা ধার করে আমি বলব, ংরষবহপব ড়ৎ ারড়ষবহপব, কোনোটাই আমাদের পথ হতে পারে না। ভারতে মুসলমানদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আর অবিশ্বাস সৃষ্টি হলে তা আয়নার মতো প্রতিফলিত হয়ে বাংলাদেশের হিন্দু ও অপরাপর সংখ্যালঘুদের জন্যও নিরাপত্তাহীনতা, অবিশ্বাস ও সহিংসতার ঝোঁক তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশে কোনো মন্দির ভাঙার অর্থ ভারতে মসজিদ ভাঙার আশঙ্কা তৈরি করা। বাংলাদেশে মন্দির ভেঙে ভারতে মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদ করতে পারবেন কোন অধিকারে? বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টির দায়িত্ব আমাদের, যাতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মুসলমান ভাই-বোনদের মতোই নিঃশঙ্ক জীবনের অধিকারী হন। তাদের হিন্দু পরিচয়ের জন্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে যেন কোনো ক্ষেত্রে ভয়ভীতি, চাপ বোধ না করেন, জানমাল-সম্পদ, বাড়িঘর-মন্দিরের ওপর কোনো হামলার শিকার না হয়, হয়রানি, হত্যা, ধর্ষণসহ কোনো ধরনের সহিংসতার ঝুঁকিতে যাতে তারা না থাকেন। অর্পিত সম্পত্তির মতো কোনো আইনি পরিকাঠামো যেন তাদের নিপীড়নের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে না পারে।
বাংলাদেশ সরকারের ভারতীয় সরকারকে পরিষ্কার বার্তা দেওয়া প্রয়োজন যে, বাংলাদেশকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে জড়ানোকে বাংলাদেশ সহজভাবে নেবে না। ভারতের তামিলনাড়–তে শ্রীলঙ্কার তামিল শরণার্থী, বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া হিন্দু, মিয়ানমার থেকে আসা মুসলমান রোহিঙ্গা, ভারত থেকে পাকিস্তানে যাওয়া মুসলমান শরণার্থীদের মতো নতুন কোনো শরণার্থী দল যেন দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের ট্র্যাজেডির পুনারাবৃত্তির শিকার না হয়। ভারতে যে ছাত্র-জনতার গণতান্ত্রিক শক্তির অভূতপূর্ব জাগরণ ঘটছে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গেও তার সংযোগ ঘটাতে হবে।