বই পড়ার বিরুদ্ধে
আমাদের দেশে ট্রেনে-বাসের যাত্রীদের, পার্কে অবসর সময় কাটাতে আসা মানুষকে প্রকাশ্যে বই পড়তে দেখেন কি? বিভিন্ন জায়গায় দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করা আমাদের নিত্যজীবনের রুটিনে বাঁধা। এই অপেক্ষার সময় বই পড়ার অভ্যাস খুব একটা দেখা যায় কি? ফেব্রুয়ারির বইমেলা শুরু হলে ঘটা করে বই পড়া এবং কেনার যে উচ্ছ্বাস সেটা ক্ষণস্থায়ী, বই পড়া নিয়ে সাধারণ মানুষদের মনে বরং আছে একটা তীব্র বিরুদ্ধতা, আছে জনমানসে বইপড়ুয়াদের প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের ভাব। দুপাতা বই পড়া বিদ্যা দিয়ে তো দুনিয়া চলে না। দুনিয়া আসলে চলে কী দিয়ে? অতি বাস্তববাদী সাংসারিক মানুষ চাল-ডাল-তেল-নুনের হিসাব-নিকাশ করে চলতে গিয়ে বই পড়াকে বিলাসিতা মনে করে। সাংসারিক মানুষ জীবনযুদ্ধের নিত্য কাজে যা জানে বই পড়–য়ারা তাদের সেই জাগতিক জ্ঞানের কাছে দুগ্ধপোষ্য শিশু।
জাতি হিসেবে বই পড়ার ব্যাপারে আমাদের প্রবল অনীহা। আমাদের প্রাত্যহিক পারিবারিক জীবনে বই পড়ার বিরুদ্ধে অভিভাবকরা। বিচিত্র পাঠাভ্যাস মোটামুটিভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়। বইয়ের বিরুদ্ধে আমাদের আছে একশ একটা অকাট্য যুক্তি। বই পড়া মানে সময় নষ্ট। বই পড়া আমাদের জীবনে এক নিরানন্দ একঘেয়ে কাজ, যেটি আমরা শুধু পরীক্ষা পাসের জন্য করি, চাকরি পাওয়ার জন্য করে থাকি। পরীক্ষা আর চাকরির প্রয়োজন না থাকলে কে বই পড়ত? স্বেচ্ছায় মনের আনন্দে কে বই পড়ে? কবিতা মুখস্থ করে দাঁড়ি, কমাসহ লেখার বুদ্ধি কোন প্রতিভাবানের আল্লাহ মালুম। তরুণ মনের কবিতা পড়ার আনন্দকে এভাবে অঙ্কুরেই বিনাশ করে দেয় স্কুল। স্কুলজীবন থেকেই বই-পুস্তককে শিশুদের জীবনে এক দুর্বিষহ ভার হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা কাউকে ভয় দেখানোর সময় হুমকি দিয়ে বলি ‘তোকে এমন শিক্ষা দেব না, যে বাপের নাম ভুলে যাবি’, ‘এই নিয়া তোমারে পড়ানো হবে’, ইত্যাদি। পড়ানো, পড়া এই ক্রিয়াগুলো আমাদের মনের ভেতরে গভীর ক্ষত তৈরি করে দিয়েছে।
‘পড়ানো’ একটা সহিংসতা আর পাঠক নিষ্ক্রিয় ভিকটিম। এতে ক্ষমতাবান পড়ায়, পড়ে ক্ষমতাহীন। তাই কেউ কিছু জানাতে চাইলে আমরা আক্রান্ত হই, ক্ষেপে যাই, ‘আমাকে শেখাতে আসছিস?’ আমাদের আত্মসম্মানে লাগে। তদুপরি ‘পড়া’ ক্রিয়াটি এ দেশে এলিট সংস্কৃতির প্রতীক, তাই তা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির আধিপত্যের প্রতীক। পড়ার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো তাই এ দেশে বিপ্লবী বোলচালে ঢুকে আছে। সবচেয়ে বড় কথা, পড়ার স্ফূর্তিটা নেই। বই পড়ার বিরুদ্ধাচরণ সংস্কৃতির গভীরে শেকড় ছড়িয়ে ফেলেছে। তাই পড়ার বিরুদ্ধতার সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলা বলতে গিয়ে নিজেই বাস্তবতা-বিবর্জিত এবং একঘেয়ে পুস্তকের কীট সাব্যস্ত হওয়ার ঝুঁকি নিতে হয়। সেই ঝুঁকিটা আমাদের কাউকে না কাউকে নিতে হবে।
বই পড়ার, পাঠক গড়ার সামাজিক আন্দোলনকে আমাদের দেশের অনেক বিপ্লবীর না-পছন্দ। বই পড়ে সমাজ বদলায় না, মানুষ বদলায় না, জাতি গঠন করা যায় না। আজকে ক্যাপিটাল পড়লে কালকেই আপনাকে সমাজবিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। নয়া উদারবাদী সমাজে বই আর দশটা পণ্যের একটি ছাড়া আর কিছুই নয়, তাই বই পড়ার সঙ্গে মানস গঠনের কোনো সম্পর্কও নেই। আর দশটা পণ্যের ভোক্তা হতে কোনো বাধা নেই, বাধা শুধু বইয়ের বেলায়। অন্য পণ্যের কাছ থেকে তো সমাজবদলের আকাক্সক্ষা রাখেন না, তাহলে বইয়ের কাছে রাখেন কেন? আপনি অলস, অকর্মণ্য, অপদার্থ, আপনি চেয়ার থেকে নড়বেন না, আপনাকে নড়াবে বই? বইয়ের মতো একটি জড়বস্তুর কাছে এত উচ্চাশা কেন? আপনি চিন্তার সুযোগ কীভাবে তৈরি করছেন? আপনার সক্রিয়তা কই? একে অপরের চিন্তার সঙ্গে যোগাযোগের রাস্তায় বই না রেখে কী রাখতে চান? চিন্তার যোগাযোগে বই ছাড়া আর কোন কোন বাহনের আশ্রয় নেবেন? এর কী জবাব হতে পারে আমার জানা নেই। একবার আমি ‘জীবন বদলে দেওয়া মহামূল্যবান ১০টি বই’ এমন একটি প্রবন্ধ শেয়ার করেছিলাম। আমার এক বন্ধু মন্তব্য করল, বই জীবন বদলে দিতে পারে এসব হাস্যকর কথা। কথাটা খুব অযৌক্তিক নয়। আপনি যেদিন বদলানোর জন্য প্রস্তুত, সেদিন হামানদিস্তাও আপনার জীবন বদলে দিতে পারে। যেদিন আপনি প্রস্তুত নন, সেদিন কোরআন-পুরাণ-বাইবেল-ক্যাপিটাল-মহাভারত-অরিজিন অব স্পিসিস-ইন্টারপ্রিটেশন অব ড্রিমস-কোনোটাই আপনার অন্তরের গুহায় প্রবেশ করতে পারবে না। আপনি যে সক্রিয় পাঠক নন, তার দায় বইয়ের কেন হবে?
অলসভাবে বই পড়ার পরিবর্তে অলসভাবে টিভি-ভিডিও দেখলে কিন্তু কেউ আক্রান্ত বোধ করে না। আপনি জ্যামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতে পারেন, ফেইসবুকে লাইক গোনার সময় পাবেন, ইউটিউবে আপনার নানা ধরনের গসিপ ভিডিও দেখার সময় আছে, বাজার করার সময় আছে, বিল দেওয়ার সময় আছে, বাচ্চার স্কুলের সামনে চাদর বিছিয়ে প্যাঁচাল পাড়ার সময় আছে, কিন্তু বই পড়ার সময় নেই। বই পড়বে শুধু আঁতেলরা। শ্রমিক-কৃষক, কেরানি, সাধারণ শিক্ষার্থী, গৃহিণী, মুদি দোকানদার, দর্জি, কাজের বুয়া বই পড়বে না। কেন? আমজনতা বই পড়বে না কেন? বাংলা ভাষায় রচিত রান্নার বই থেকে শুরু করে, ব্যায়াম, ঘরসাজানো, ফ্যাশন, ডায়েট, জলবায়ু পরিবর্তন, আত্মজীবনী, ভ্রমণ-কাহিনী, শিশু-কিশোরদের গল্প, জীবনযাপন, ইতিহাস, দর্শন, উপন্যাস, গল্প, কবিতা বিচিত্র বিষয়ে বই পড়া আমজনতার খাদ্যতালিকায় আসা সম্ভব নয় কেন?
বিশ্ববিদ্যালয়ে কমপক্ষে বই পড়ার সংস্কৃতি থাকতে পারত। কিন্তু হায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতিও বই পড়ার বিরুদ্ধে। বিশ্বাস করেন আর নাই করেন, বিশ্ববিদ্যালয়েও খুব সামান্য মানুষ পড়ে। পরীক্ষা, প্রমোশন, পাবলিকেশন, কনসালট্যান্সি ছাড়া পড়ার আর কোনো প্রণোদনা নেই। যারা পড়ুয়া, বন্ধুরা তাদের হয় এক ধরনের তাচ্ছিল্য করে অথবা ভয় পায়। শিক্ষকতায় যোগ দিতে চাওয়া শিক্ষার্থী ছাড়া বাকি শিক্ষার্থীরা নিজের সক্রিয় পাঠাভ্যাসে নিজের জানা-বোঝা গড়ে তোলার কোনো প্রেরণা খুঁজে পায় না। অধিকাংশ পড়ুয়া বিসিএসের বই ছাড়া আর কোনো বই জীবনে কাজে লাগবে মনে করে না। সেমিনার রুমে যে শিক্ষার্থী পড়তে চেষ্টা করে, তাকে বন্ধুদের হাতে এক ধরনের লাঞ্ছিত হতে হয়। আমি দেখেছি, যারা পড়ে, তারা বন্ধুদের সঙ্গে নিজের পড়ার বিষয়টি গোপন করে। বই হাতে সেমিনারে, শিক্ষক লাউঞ্জে, বাসে, মাঠে, বেঞ্চিতে কোথাও বসে শান্তি পাবেন না। বই হাতে দেখলেই লোকে আপনাকে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ছাড়বে : কী বই পড়েন? গল্পের বই? না পড়ার বই? বুঝতে চেষ্টা করে, এখানে বসে আপনি পড়ছেন কেন? আপনার কোনো কাজ নেই? প্রকাশ্যে কেউ বই পড়লে আশপাশের লোকরা হঠাৎ আক্রান্ত বোধ করে। প্রকাশ্যে মূত্রত্যাগ করলে আক্রান্ত বোধ করে কি? কেউ বেশি জেনে ফেলতে পারবে না, কারও কাছ থেকে জানা-বোঝা-শেখারও কোনো প্রয়োজন আমার নেই। কোনো গম্ভীর বিষয়ে আপনি আলাপ করবেন না, রসাত্মক-তির্যক মন্তব্য করবেন না, সারাক্ষণ মাথা নাড়বেন, হে হে আর ফাতরামি করতে থাকবেন। আপনি যে একজন বিদগ্ধ ব্যক্তি, শিল্প-রসিক, সাহিত্যে আপনার অগাধ জ্ঞান, আপনি যে নিজেই একজন প্রাজ্ঞ দার্শনিক, ভাবুক, বক্তা, কবি, তাকে লুকিয়ে আপনার সবচেয়ে ঘিয়ে ভাজা আটপৌরে চেহারাটা নিয়ে জনসম্মুখে হাজির হলেই সামাজিক আলাপচারিতায় ‘বেইল’ পাবেন। জাতি হিসেবে আমরা বই পড়ার বিরুদ্ধে।